যতীন সরকার : আমাদের ‘কমল পাথর’

Scream
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

রবীন্দ্রনাথের ‘শেষের কবিতা’ উপন্যাসে বর্ণিত ‘কমল হিরের পাথর’ সম্পর্কে সচেতন পাঠক কম বেশি অবগত। কোটিতে গুটিকে এর সন্ধান মিলে। পাথর প্রাপ্তি মানুষকে আমরা বলতে পারি গুণধর পাত্র, বা গুণের আধার। পাথরের রয়েছে ভার। তার থেকে ঠিকরে পড়া আলোর রয়েছে দীপ্তি। সেতো আর যে- সে পাথর নয়। বিদ্যাতুল্য পাথর। একবারে খাঁটি ‘কমল হিরের পাথর’। এই ভারকে বিদ্যা এবং তা থেকে ঠিকরে পড়া আলোকে সংস্কৃতি বলে বিবেচনা করা হয়েছে শেষের কবিতা উপন্যাসে। অর্থাৎ বিদ্যার উন্নততর ধাপের নাম সংস্কৃতি। যাঁর মাঝে থাকে মানুষের সম্যক কৃতি। সেই কৃতির ‘ইতি’ যত বাড়ে মানুষের বিবেক ততই হয় সামাজিক। এ সংস্কৃতির লালনে মানুষ কূপমন্ডুক অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে পারে। তাতে করে সে, অমানুষের স্তর থেকে ‘প্রায়-মানুষ’এবং ‘প্রায়-মানুষ’ থেকে যথার্থ মানুষে পরিণত হতে পারে। অতএব কর্তব্য, পাথর সন্ধান। কিন্তু বর্তমানে পাথর বলতে আমরা যে প্রাণহীন বস্তুটিকে বুঝি তার কদরই যেন বাড়ছে দিন দিন। হিরে ফেলে প্রতারক কাঁচখন্ডে ধাবিত হচ্ছে মানুষ। যুক্তিহীন প্রযুক্তির এই যুগে গ্রাম্য নাটকের ‘বিবেক’ চরিত্র মেলা ভার। আমাদের স্বাধীন দেশের মানুষের মাঝে আত্মকেন্দ্রিকতা অতিমাত্রায় ভর করেছে। তাই নিকট অতীতের সত্যেন সেন, রণেশ দাশ গুপ্ত, সরদার ফজলুল করিমদের উত্তরসূরীর সংখ্যা আজ একেবারেই হাতে গোণা। এমন দুর্লভ দৃশ্যে যিনি স্ববিরোধী নন, দর্শনে নন বিচলিত; বিদ্যা অর্জনে যাঁর উপার্জন ভেজালমুক্ত; যিনি মানব মুক্তির পথের অনুসন্ধান করতে করতে ভোগবাদী ফাঁদে এক মুহূর্তের জন্যও ধরা দেন নি; ‘যে পেয়েছে সবচেয়ে কম, দিয়েছে তাহার অধিক এমন ব্যতিক্রমী একজন মানুষ, আমাদের যতীন সরকার। যিনি নিপীড়িত মানুষের মুখচ্ছবি, দেখে দেখে সাদা-সরল জীবনে অভ্যস্ত হয়েছেন। ‘মূর্খের উন্নতি’ অপেক্ষা ‘জ্ঞানীর গৌরব’ই তাঁর পাথেয়। দারিদ্র্যে ‘ইয়ার্কি মারা’ সহজ কাজ নয় জেনেও তিনি তাই করেছেন। এভাবেই তিনি বেড়ে উঠেছেন; এবং বড় হয়েছেন। এমন সাহস বর্তমান বিদ্যাজীবীরা দেখাতে চান না। তাই বিদ্যাজীবী এবং বুদ্ধিজীবী পার্থক্যটি আমাদের চোখের সামনে সহজেই ভেসে ওঠে। যতীন সরকার মোটেও বিদ্যাজীবী নন; বিদ্যাকে তিনি জীবিকার আশ্রয়ে প্রশ্রয় দেননি । ‘জীবনের জন্য বিদ্যা, ‘মানুষের জন্য বিদ্যা’ এই মন্ত্রে দীক্ষা নিয়েই তিনি বুদ্ধিজীবী। তিনি সময়ের ভবিতব্য প্রত্যক্ষ করেন দূরদৃষ্টি দিয়ে। তাই তাঁর দারিদ্র্য ‘কণ্টক মুকুট শোভা তাপসে’ পরিণত হয়। আর এভাবেই তিনি পরিণত হয়ে যান ‘কমল হিরের পাথরে’। তাঁর জীবনের ৮০ বছর আত্মতৃপ্তিতে ভরা। অনেকের সেই তৃপ্তি নেই। দারিদ্র্য এবং গৌরবের যুগলমঞ্চে আসীন হওয়া সবার ভাগ্যে জোটেনি। এ-গৌরব তিনি অর্জন করেছিলেন অনেক কঠিন পথ মাড়িয়ে। জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণে, অর্থ উপার্জনের বদলে গৌরব অর্জনে মনোনিবেশ করেছেন। এভাবেই তাঁর জীবন নাট্যে আসে অবিরাম গতি। সে গতির নামই প্রগতি। তাঁর জৈবিক আবেগিক ধাত অতন্ত সরস। কখনো কল্পনার বুদ্বুদে মিশে না। উচ্ছ্বাসে ভাসে না। কৈশোর থেকেই যুক্তিবাদী। গ্রাম পর্যায়ের এলিটদের সাথে বসে আড্ডা দেয়া পুঁচকে ছোঁড়া, সরকারের পাঠপর্ব শুরু বঙ্কিমীভাষা দখল করে। ‘বটতলার বই’ প্রথম জীবনে প্রলুব্ধ করেনি বলেই নিজেই নিজের সমালোচনা করে বলেন ‘এঁচড়ে পাকা’। বৃটিশ পিরিয়ডে জন্ম। পাকিস্তানে বালকত্ব ফুরায়নি। কৈশোরে কোমল অন্তর দগদগে। দুর্ভিক্ষ, হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গাসহ নানাবিধ অনাচার: হিন্দুদের মধ্যে আতঙ্ক, দেশ ত্যাগ, মুসলমান বন্ধুদের হঠাৎ পরিবর্তন, পাকিস্তানিজোশ, সাম্প্রদায়িক মালাউন ডাক, এসব অনুভূতি, তাঁর চেতনাকে আলোড়িত করে। বিক্ষুব্ধও করে। সাম্প্রদায়িক কারণে বাবার আয়ের উৎস (গ্রাম্য ডাক্তারি) একেবারে তলানিতে এসে ঠেকে। কঠিন ভবিষ্যতের মুখোমুখী হবার আশঙ্কায় পরিবারের সদস্যদের সাথে তিনিও চঞ্চল হয়ে ওঠেন। তাঁর মাঝে ‘হাতে খড়ি’। মখস করেছেন রামপুর ফ্রি প্রাইমারি স্কুলে; (১৯৪৩-৪৬) নিজ গ্রামে। অবশ্য সে-অবস্থা স্থির হয়নি বেশি দিন। পঞ্চম শ্রেণিতে ওঠে চলে যান মামার বাড়ি, মুক্তাগাছার পারুলিতলার হাতিল গ্রামে। সেখান থেকেও ফিরতে হয় নেত্রকোনার চন্দ্রনাথ হাইস্কুলে। আবার বাধা, যেখানে থেকে পড়া, সেই পিসিমারা কুচবিহারে চলে যাওয়ায় অনেকটা বাধ্য হয়েই চলে আসতে হয় পাশের গ্রামের বেখৈরহাটি স্কুলে। কিন্তু ১৯৫০ সালের দাঙায় সে-স্কুলও বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৫১ সালে ভর্তি হলেন আশুলিয়া স্কুলে । তারপর নানা প্রতিকূলতা। ক্ষত-বিক্ষত যতীন সরকার অনেকটা দেরিতে (১৯৫৪ সালে) মেট্রিক পরীক্ষায় অবতীর্ণ হন। অর্থাভাবে আই-এ ভর্তিতেও ছেদ পড়ে। অতঃপর ১৯৫০ সালে নেত্রকোনা কলেজে ভর্তি হন। নেত্রকোনা শহরে লজিং থেকে লেখাপড়া করার সময় অর্থ সঙ্কটে পড়ে লজিং পরিবার। ফলে তাঁদের সাথে তাঁকেও অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটাতে হয়। এভাবেই চলে দুর্ভাবিত সময়ের চক্র। ১৯৫৭ সালে ময়মনসিংহ আনন্দ মোহন কলেজে ভতির্র সুযোগ পান তিনি। জীবনের এই চালচিত্রে, অনেককিছু হারিয়েও ধৈর্য হারা হননি। ‘কমল হীরের পাথরের’ সন্ধান পাবার এই হলো তাঁর গোপন চাবি। ১৯৫৯ সালে বি-এ পরীক্ষা দিয়েই আশুলিয়া হাই স্কুলে শিক্ষকতা জীবন। শিক্ষকতা করে টাকা জমিয়ে ১৯৬১ সালে তিনি ভর্তি হন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে। সেখানে এম-এ ক্লাশের ছাত্র হন। ১৯৬৩ সালের নভেম্বরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পরীক্ষায় সফল উত্তীর্ণ হন। তাঁরপর গৌরীপুর হাই স্কুলে যোগদান। পেশা জীবনের প্রথমে স্কুল শিক্ষকতা। কিন্তু কোনো এক কলেজ শিক্ষক তাঁর জীবনের আর্দশ হয়ে ওঠে। সে থেকে কলেজ শিক্ষকের প্রতি দুর্বলতা। সুযোগ আসে ১৯৬৪ সালে ময়মনসিংহ নাসিরাবাদ কলেজে অধ্যাপক হবার। ১৯৬৭ সালে ‘পাকিস্তানোত্তর-পূর্ব পাকিস্তানের বাংলা উপন্যাসের ধারা’ প্রবন্ধের জন্য ‘ড. এনামুল হক স্বর্ণ পদক’ লাভ করেন। সে সময়ই সমকালীন লেখকদের উপন্যাস পাঠ করে একটি আর্দশ শ্রেণীবিন্যাস তিনি করেছিলেন। গবেষণাব্যাপৃত এই অধ্যাপনার জীবনই তাঁর চলার পথকে মসৃণ করে তোলে। অধ্যাপকের চেয়ে বড় জ্ঞানী-গুণি কেউ নেই; এমন ধারণা তাঁর বদ্ধমূল। তাই আজীবন কলেজ শিক্ষকের গন্ডিবদ্ধ জীবনে তৃপ্তির সাথে স্বীয় পেশায় নিয়োজিত থেকেছেন। সেই শিক্ষকতা পেশার সফল পরিক্রমায় আজ তিনি গণ-শিক্ষক; এবং গণ-বুদ্ধিজীবী। লেখালেখির শুরুটা অধ্যাপনার পর্ব থেকেই। নিজেকে প্রায়ই ‘কষ্ট লেখক’ ‘প্রতিভা-টতিভা কিচ্ছু নেই’ বলে গভীর বিনয় প্রকাশ করেন। পঞ্চাশের পরেই সংগঠন, রাজনীতি, শিক্ষকতা, দেশ-বিদেশ ভ্রমণ। তারপর সু-চিন্তিত পাঠে মনোনিবেশ। এতে এতই পারঙ্গম হয়ে উঠলেন যে, বিরুদ্ধবাদীরা আতঙ্কিত না হয়ে থাকতে পারেননি। ভাষা আন্দোলনের চোঙাফুকানো এক সময়ের বিস্ময় বালক, মধ্য-যৌবনে মার্কসবাদী দর্শনে বেশ পরিপক্ব হলেন। ফলে দল এবং দেশের মাঝে তিনি হয়ে গেলেন অন্যতম কেউকাটা। শোষক শ্রেণী, শোষিত শ্রেণী নিপীড়িত শ্রেণী শাসক-শাসিত, শ্রেণীসংগ্রাম, উৎপাদন-বণ্টন, উদ্বৃত্তমূল্যতত্ত্ব ইত্যাদিতে অবিরাম পরিবর্তন, আবর্তন-বিবর্তন; এবং তাতে বস্তুর ধর্ম অনুযায়ী সংগ্রাম; সেই সাথে শোষণ নিপীড়ন যে কোনো সমাজ ব্যবস্থায় চিরস্থায়ী নয়, এমন সুনিপুণ ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি সমাজের গর্ভকে উজ্জীবিত করে চলেন। মার্কসবাদী সিদ্ধান্তে দাস প্রথার পরিবর্তন; সামন্ত প্রথা, ধনতন্ত্রের জন্ম- তারই ধারাবাহিকতায় সমাজতন্ত্র; তাও বিরোধী শক্তি ধনতন্ত্রের গর্ভে! একদিন এ-পথেই আসবে ‘আমরা সবাই রাজা’ হবার মতো এক সাম্যবাদী পৃথিবী! এসব কথা বলে বলেই তিনি পরিণত হয়েছেন। তাঁর উচ্চকিত ভাষার রসজ্ঞ বাগ্মীগুণে ক্রমাগত নন্দিত হতে লাগলেন কার্ল মার্কস-এঙ্গেলস-লেনিন। মার্কসবাদী দর্শন সর্ম্পকে তাঁর বিশেষ কোনো গোঁড়ামি আছে বলে যাঁরা ভাবেন তাঁরা ভুল করেন। এর-চেয়ে উত্তম কোনো দর্শনের সন্ধান পেলে তিনি পূর্বতনটিকে, ছিন্ন চটিকার মতো পরিত্যাগে দৃঢ়তা প্রকাশ করেন। এ দৃঢ়তা তিনি শিখেছেন বিখ্যাত মানবমন পত্রিকার সম্পাদক ধীরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়; এবং রাশিয়ার মনোবিজ্ঞানী পাভলভের কাছ থেকে। ধীরেন্দ্রনাথ এবং পাভলভ তাঁর জীবনকে নতুনভাবে শাণিয়ে দিয়েছে বলেই তিনি বলতে পারেন, ‘মার্কসবাদ অতিক্রম করাই প্রগতি, এড়িয়ে যাওয়া আত্মঘাতী।’ ধীরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের অনুসারী যতীন সরকার মনোজগতের রহস্য উন্মোচনে ফ্রয়েড পরিত্যাগ করে রাশিয়ার মনোবিজ্ঞানী পাভলভের চিন্তাধারার প্রতি যত্নবান হন। এবং এ-দেশে স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে পাভলবীয় চিন্তার মার্কসবাদী দর্শনের অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণের তিনিই কর্ণধার। এসবে মুন্সিয়ানা তাঁর যতই বাড়ে, ততই রাষ্ট্রপক্ষ হয় উত্তেজিত। পঁচাত্তরের পট পরিবর্তনের পর এভাবেই তাঁর উপর খড়গ্ নেমে আসে। ফলে অতীতের রাষ্ট্রচিন্তক, গণ-মানুষের বিপ্লবীনেতাদের মতো তাঁর জন্যও নির্ধারিত হয় কারাশ্রম। দুর্ভাগ্য বিরোধী চৈতন্যের। যে-কারণে তাঁকে কারাশ্রমে পাঠানো হয় সেখানে বসেই তিনি লিখেন শোষিতের নাটক ‘সব পাওয়ার মন্ত্র’। চীনের একটি প্রবাদকে সম্বল করে মুক্তির নিরিখে লেখা এ-নাটক মূলত, শোষিত মানুষের প্রেরণার বিন্দু। কারামুক্তির পর তিনি আবারও স্বরূপে আর্বিভুত হন। শাসনের নামে শোষকের ভেলকিবাজী খতমে তাঁর বক্তৃতা হয়ে ওঠে এক একটি অগ্নিশলাকা। পরবর্তী প্রতিটি মুহূর্তের সাংস্কৃতিক বিভিন্ন আন্দোলন; এবং বহু কর্মযজ্ঞে তিনি নিবেদিত থেকেছেন। তাই লেখা-লেখির হাতটা পাকাতে সময় লেগেছে একটু বেশি। ‘সাহিত্যের কাছে প্রত্যাশা’ (১৯৮৫) দেরিতে আত্মপ্রকাশ তারই প্রমাণ। তারপর বিবিধ গ্রন্থ রচনা করেন তিনি। সে-সকল গ্রন্থে কোনো আবেগের স্থান নেই। তার লেখা পাঠককে সর্বদা জাগ্রত করে। ভাবিত করে, কখনো কখনো দুর্বল ভাবনার অবসান ঘটিয়ে নতুন দিগন্তের উন্মোচন করে। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় লেখা প্রকাশ করে যাচ্ছেন তিনি। পাঠকবৃন্দ তাঁর ‘পাকিস্তানের জন্ম-মৃত্যু দর্শন’ এর মাধ্যমে তাঁর প্রকৃত সত্তার পরিচয় পেয়ে যান। ২০০৪ সালে গ্রন্থাকারে এটি প্রকাশিত হলে দেশময় সাড়া পড়ে যায়। এ-গ্রন্থই তাঁকে পাদপ্রদীপের আলোতে নিয়ে আসে। তারপর ‘প্রথম আলো বর্ষসেরা পুরস্কার’ (২০০৫); ‘বাংলা একাডেমি পুরস্কার’ (২০০৭) এবং ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’ (২০১০)। দর্শনের হালকা রসিকতার মধ্যে দিয়ে ‘পাকিস্তানের জন্ম-মৃত্যু দর্শন’ গ্রন্থটি সাম্প্রদায়িকতা; দ্বিজাতিতত্ত্ব; হিন্দু মধ্যবিত্তের মানস সংকটে গ্রামীণ ও শহরে সমাজের ইতিবৃত্ত এখানে উপস্থাপিত হয়েছে। বলতে দ্বিধা নেই উপমহাদেশের ধর্মের অভিজ্ঞতা বড়বেশি তিক্ত। ধর্ম মানে এখানে সাম্প্রদায়িকতা। প্রথমে ঘৃণা তারপর হানাহানি। ব্রিটিশের অন্তিম পর্ব থেকে পাকিস্তানের অন্তিম পর্বটিতে ধর্মের যে বিরূপ চিত্রটি তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন; তা তাঁর বক্তৃতা এবং লেখায় বিচিত্রভাবে প্রকাশিত হয়েছে। ধর্মের নেতিবাচক দিক তিনি যেমন প্রত্যক্ষ করেছেন; তেমনি ইতিবাচক রূপও কম দেখেননি। সে ধর্মের মর্ম কথার মধ্যেও শোষণমুক্ত সমাজ ব্যবস্থার বীজমন্ত্রটিও খুঁজে পেয়েছেন তিনি। উপমহাদেশের ধর্ম বাস্তবতা তিনি অত্যন্ত বিজ্ঞজনোচিতভাবে আয়ত্ত এবং সুবুদ্ধি দিয়ে ব্যবহার করেছেন। ধর্ম মূলত, আত্মশক্তি লাভ এবং আত্মবিকাশের জন্য। তা কখনো মানুষের সাম্প্রদায়িকতার কারণ হতে পারে না। এসব কথা তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছেন বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ পাঠ; এবং লোকায়ত জীবনের হিন্দু-মুসলমানের সম্পর্কের ভেতর থেকে। সাম্প্রদায়িকতা এবং কুসংস্কাররূপী ব্যাধিগুলো একদিন লোকায়ত প্রভাবেই সেরে উঠবে, এ ব্যাপারে তিনি প্রত্যয়দীপ্ত। বাগ্মীরূপী যতীন সরকার বাংলাদেশের প্রগতির পথনির্মাণে ভূমিকা রেখেছেন। সাহিত্য-সংস্কৃতি থেকে গড়ের মাঠ পর্যন্ত সমাজের নানাবিধ বিষয়ে সচেতনতামূলক বক্তৃতা দিয়ে মানুষকে জাগাবার চেষ্টা করেছেন। সত্যেন সেনের গড়া উদীচী, বাংলদেশের কমিউনিস্ট পার্টি তাঁকে সাহায্য করেছে। উপান্তবেলায়, উদীচীর কেন্দ্রীয় কমিটির হাল ধরেছেন সফলভাবেই। সভাপতি হবার পর দেশ-বিদেশে নিজস্ব ঢঙের বক্তৃতা আগামী দিনের কমরেড তৈরি করার পথ, কিছুটা হলেও সুগম হয়েছে। অগণিত হতাশার মাঝেও তিনি ছিলেন প্রান্তিক অবহেলিত মানুষের আশার আলো’। ৭২-এর সংবিধান ভূলণ্ঠিত, দেশের মৌলনীতি থেকে সমাজতন্ত্র উচ্ছেদ; বৈশ্বিক পরিম-লে সমাজতন্ত্রের আপাত বিপর্যয়েও তিনি অকপট ভবিষ্যৎ দ্রষ্টার মতো কলম চালিয়ে যান; আমাদের জাগান। ব্যথাতুর হৃদয়ে সুন্দরের সুর তোলেন। জীবনের নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রামের কথা বলেন। ‘আইনের শাসন মানেই ন্যায়ের শাসন নয়’ বলে সর্তক করে দেন। তাঁর লেখা মৌলবাদী, শোষক-সাম্প্রাদায়িক ভেদ বুদ্ধি সম্পন্ন মধ্যবিত্ত; পুঁজিবাদ কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারী, নিপীড়ন বাদী অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে, সর্বদাই উচ্চকণ্ঠী। উদ্দিষ্ট লক্ষ্যের প্রকৃত অভিসারী তিনি।
জীবন-সংগ্রামের শেষ সময়ের বাধা অসুস্থ শরীর। আর্থরাইটিস নামক ব্যাধি তাঁকে প্রায় পঙ্গু করে ফেলে। সিংহবিক্রমে যে-মানুষ যৌবনে চারদিক ছুটে বেরিয়েছেন তিনি আজ বাসায় আবদ্ধ। কিন্তু মন! অসাধারণ বিত্ত-সম্পদ ও যৌবনশালী। আকাশ ফাটানো হাসিতে তিনি মাতিয়ে তুলতে পারেন যেকোনো মুহূর্ত। বর্তমানে বসবাস নেত্রকোনার শহরের মগড়ানদীর পাড়। সেখানে ‘সাতপাই’ নামক স্থানে ভাই-বোনের সাথে যুগলবন্দী বাসা। বাসার নাম বানপ্রস্থ। ২০০২ সাল। দেশব্যাপী চলে লাগাতার সিরিজ বোমা হামলা। নেত্রকোনা উদীচী অফিস টার্গেটে পরিণত হয়। দৈবক্রমে বেঁচে যান তিনি। ১৮ আগস্ট এই কীর্তিমানের জন্ম। এ-দিন তিনি আশি বছরের মাইল ফলক অতিক্রম করবেন। সে দিন, জন্ম দিনের ফুলেল শুভেচ্ছায় ভীড় জমাবে ‘বানপ্রস্থ’। প্রতিদানে যতীন সরকার, জুড়ে দেবেন মানবজাতির ভবিতব্যের সেই সব কথা; যাতে থাকবে মানুষ হওয়ার মূলমন্ত্র, এবং মুক্তির সারবার্তা। সে-সব মুক্তির কথা শুনতে শুনতে মনে পড়ে যাবে, কবি গুরুর ‘শেষের কবিতা‘ উপন্যাসের ‘কমল হিরের পাথরে’র কথা; মনে পড়বে মহাকবি ইকবালের খুদি কবিতার ‘আমি’ যিনি ‘পাথরকে করে দেয় আয়না/বিষ হতে বানায় মধু।’

স্বপন ধর সম্পাদক ‘জলদ’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সমাজ ও রাজনীতি

শিল্প-সাহিত্য

ক্রীড়া

এবার আকাশে ওড়ার পালা

ফুটবলে আশার আলো মেয়েরা। সেই আলোটা দেখাচ্ছে কৃষ্ণা-সানজিদারা।…

ফিচার

সৌদি মরুভূমিতে বাংলাদেশিদের মরুদ্যান

মরুভূমির দেশ সৌদি আরব। ঊষর মরুর ধূসর বুকেই কিনা গড়ে উঠেছে বাংলাদেশের সবুজের জয়গান! মরুভূমির ধুলাবালির মাঝে গড়ে উঠছে কৃষিখামার।…

বিনোদন

মা হচ্ছেন সুনিধি চৌহান

সোমবার ছিল বলিউড গায়িকা সুনিধি চৌহানের ৩৩তম জন্মদিন। আর এদিনই জানালেন খুশির খবরটি, মা হতে চলেছেন এই গায়িকা। সম্প্রতি সুনিধি…

বাজার ও অর্থনীতি

সঞ্চয়পত্র বিক্রিতে সরকারের রেকর্ড

সরকারের সঞ্চয়পত্র বিক্রি রেকর্ড ছাড়িয়েছে। সদ্য সমাপ্ত ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৫২ হাজার ৩২৭ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি করেছে সরকার, যা এ…

রাজধানী

বইয়ের জগৎ

An error occured during creating the thumbnail.

রাতের প্রতিপক্ষ একটি বাতি

অনাত্মীয় সুতোদোর টানাপোড়েনে তৈরি যে ঘনবদ্ধ কাপড় তা আপনার দেহকে ডেকে রাখবে সত্যি কিন্তু মনের আবেগকে না। অন্যের কাছে আত্মীয়হীন…

ইভেন্ট

An error occured during creating the thumbnail.

মায়ের প্রতি ভালবাসা

আজ ১৪ মে রোববার বিশ্ব মা দিবস। মা দিবস একটি সম্মান প্রদর্শন জনক অনুষ্ঠান যা মায়ের সন্মানে এবং মাতৃত্ব, মাতৃক…