পলল প্রকাশনী

সত্য-মিথ্যা

Scream
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের গল্প

অনেক ভোরে ঘুম ভাঙ্গে লতিফ সাহেবের। বুড়ো মানুষ, ঘুমটা তেমন জুৎসই হয়না। রাত বিরাতে বাথরুমও ডাকে। কিন্তু বালিশ উল্টে পাল্টে, পাশ ফিরে-চিৎ হয়ে-বিছানা থেকে ওঠানামা করে ছটা ঘণ্টা পার করতে পারলেই তিনি ভাবেন, যথেষ্ট ঘুম হল, এখন দিনটাকে একটা সালাম জানাতে হয়।
লতিফ সাহেবের স্ত্রী বেঁচে থাকতে, বছর তিনেক আগেও, এত ভোরে তার ওঠা হত না। শুধু যখন আজান পড়ত, তিনি উঠে, পরিষ্কার হয়ে, ওজু করে নামাজ পড়তে যেতেন। একটাই মসজিদ গ্রামে, পোয়া মাইলের মতো হাঁটতে হয়। কিন্তু হাঁটতে তার ভাল লাগে, বিশেষ করে ভোরে। এখন আজানেরও আগে তিনি বেরিয়ে পড়েন। রাতটা কালো হতে হতে ক্ষান্ত দিয়ে যখন একটুখানি ঝিলিমিলির দিকে যায়, তিনি ঘর থেকে বেরোন। হাঁটেন। মাঝে মাঝে উষ্টা খান। পড়েও যান দু’ একবার, কোনো কোনো দিন। ব্যথাও পান। কিন্তু মসজিদে পৌছে মুসল্লিদের কাতারে দাঁড়ালে সব ব্যথা ভুলে যান। মনটা প্রসন্ন হয়ে যায়।
লতিফ সাহেব যে এত ভোরে বের হন, কেউ কি তাকে বাধা দেয়না একটু আলো ফুটলে যেতে বলেনা? অথবা কাজের লোক করম আলির ১৩/১৪ বছরের ছেলেটাকে সঙ্গে দিয়ে সাবধানে যেতে বলেনা? বলেনা। তবে একজন বলতেন, লতিফ সাহেবের স্ত্রী, রেজিয়া বানু। তিনি দেহরক্ষা করলে তাদের দুই ছেলের একজনও এসব করার প্রয়োজন বোধ করে না। করবে কি, সকাল আটটার আগে তাদের ঘুমটা তো ভাঙ্গেনা। আর তাদের স্ত্রীরা, যাদের সঙ্গে লতিফ সাহেবের সারা দিনে দুটি বাক্য বিনিময় হয় কিনা সন্দেহ  তারা যে কিছু বলবে, কি কারণে? লতিফ সাহেব তাদের বা তাদের স্বামীদের কাছে বোঝাও না, আবার সুসংবাদও না। তিনি থাকেন তাঁর বৃত্তে। তারা তাদের; তাদের বৃত্তে যেরকম লতিফ সাহেবের ঢুকে পড়ার সম্ভাবনা শূন্য, লতিফ সাহেবের বৃত্তও তাদের জন্য দূরের জিনিষ। ছেলেরা অনেক আগেই লতিফ সাহেব থেকে তাদের সম্পদ-সম্পত্তির হিসাব বুঝে নিয়েছে, যদিও প্রতিবেশী মজহার মিয়ার সঙ্গে সীমানা বিরোধের কারণে রেজিস্ট্রি হয়নি। কিন্তু তাতে কি? জমিজমা তো আর উড়ে যাচ্ছে না। তাছাড়া ছেলে দুটি ভিলেন-টিলেন কিছু না। ভাল চরিত্রেরই। তবে বাবার জন্য তাদের কোনো আবেগ নেই। যেটুকু ছিল রেজিয়া বানুর জন্য। তিনি পরপারে চলে গেলে তাদেরও আবেগের ঘর শূন্য হল।
এখন তারা ভদ্রভাবে অপেক্ষা করবে লতিফ সাহেবের চলে যাওয়ার জন্য। তিনি চলে গেলে আধাপাকা ঘরটা তারা ভাঙ্গবে, দুতালা দালান বানাবে। দুই ভাই জমি থেকে ভাল ধানটান পায়, পুকুরও আছে তিনখানা। সেগুলিতে মাছ ফলায়। ডজন ডজন মুর্গি জন্মায় পাঁচ কাঠা জমিতে পেল্ট্রি ফার্ম করে। দু’তালা দালান তারা বানাতেই পারে।
বড় ছেলে রশিদের হিসাব মতে লতিফ সাহেবের আয়ু বছর দেড়েক। সে জানে, যেহেতু ছ’মাস আগে তার কর্মচারী খগেনকে দিয়ে বাবাকে সে শহরের ডাক্তারের কাছে পাঠিয়েছিল। ডাক্তার তার শরীরে বহুমূত্র পেয়েছে, পাইলস পেয়েছে, রক্তে উঁচু চাপ পেয়েছে, হৃদযন্ত্রে উদ্বিগ্ন করার মতো আলামত পেয়েছে। খগেনকে ডাক্তার বলেছে, বাড়ির লোকজনকে গিয়ে বলবেন, বাবার যতœ নিতে। তাঁর পটল তোলা এখন সময়ের ব্যাপার।
লতিফ সাহেবের দুই ছেলের দিকের ছয় নাতিপুতি, যেগুলোর বয়স তিন থেকে বাইশ। ছোট ছেলে বিয়ে করেছে দেরিতে, তার সন্তান ওই একটাই, বয়স তিন। তার বউটা দেখতে সুন্দর। রেজিয়া বানু বলতেন তাঁর এই পুত্রবধুই যেন আসল সুলতানা রেজিয়া, তাকে সবদিক থেকে ছাঁড়িয়ে গেছে  যেমন ফর্সা, তেমনি ছিমছাম গড়ন, চোখ কটা কটা, চুলে বাদামির আভা। একটু অহংকারি, তবে তা স্বাভাবিক। লতিফ সাহেব অবশ্য এ বাড়ির কারো মুডের ধার ধারেন না, ছোট বা বড় পুত্রবধু অথবা নিজের ছেলেদের। তিনি অবশ্য সামান্য সামলে চলেন বড় দুই নাতি নাতনিকে, বিশেষ করে মেয়েটাকে, যার বয়স বাইশ। বদমেজাজি বলে একটা পরিচিতি আছে মেয়েটির, মুখের ওপর কথা বলে, গালিগালাজেও ওস্তাদ। তবে লতিফ সাহেবের যা চোখে পড়ে তা ছোট পুত্রবধুর সঙ্গে এই মেয়েটির চটপটানি। পড়াশোনার পাট চুকিয়েছে মেয়েটি এইচএসসি পাশের পর। এখন বাড়িতেই থাকে। রেজিয়া আক্ষেপ করতেন মেয়েটি কেন সুন্দরী হয়নি, কেন এত কালো হল, তা নিয়ে। লতিফ সাহেব অবশ্য মেয়েটি সুন্দরী না অসুন্দরী তা নিয়ে ভাবেন না  তার চোখে এরকম পার্থক্যও অবশ্য ধরা পড়ে না। তিনি যা খেয়াল রাখেন, তা মেয়েটার সামনে না পড়তে। মেয়েটার নাম আলেয়া, তার ছোট ভাইটা বাবু – তার দুই বছরের ছোট। কলেজে পড়ে। একটু মাস্তান টাইপের। লতিফ সাহেব থেকে মাঝে মাঝে দশ বিশ টাকা চেয়ে নিয়ে যায়। কি করে টাকা দিয়ে কে জানে।
রাত আঁধার থাকতে লতিফ সাহেব যে বেরিয়ে পড়েন, তার একটি কারণ, হাঁটাহাঁটি করে, নামাজ পড়ে তিনি বাড়ি ফিরে আবার বিছানায় ওঠেন। এবং তিন ঘণ্টা টানা ঘুমান। এই ঘুমটাই তাঁকে বাচিয়ে রেখেছে, তার শরীরে সঞ্জীবনী শক্তির যোগান দিচ্ছে। ঘুমের এই সময়টায় বাড়ির লোকেরা কাজে অকাজে বেরিয়ে পড়ে, নাতি নাতনিদের দুজন  আলিয়া আর তিন বছরের নিশা ছাড়া। লতিফ সাহেবকে নাস্তাপানি খাওয়ার করম আলি। ভাতটা বেড়ে দেয় বড় পুত্রবধূ। ব্যস। নিষ্কণ্টক জীবন।

২. গত কয়েকদিন ধরে লতিফ সাহেব টের পাচ্ছেন, বাড়ির পরিস্থিতি গুমোট। আলেয়ার সঙ্গে ছোট পুত্রবধূ, যার নাম নাফিসা, একটা ঠান্ডাযুদ্ধ চলেছে। ঠিক ঠা-াও না, যেহেতু চিৎকার টিৎকার হয়েছে, কান্নাকাটিও হয়েছে। তার কানে এসব বেশ শক্তি নিয়েই আছড়ে পড়েছে। তারপরও তিনি কোনো প্রশ্ন করেন নি, তার অভ্যাসে সেটি পড়েনা বলে। কিন্তু করম আলি যখন জানাল, এই ঝগড়ার সূত্র ধরে দুই ভাইয়ের মধ্যে বিবাদ হচ্ছে, তখন তিনি কিছুটা উদ্বিগ্ন হলেন। করম আলি বলল, ছোট ছেলে বশির আলেয়ার জন্য একটা বিয়ের প্রস্তাব এনেছিল, কিন্তু আলেয়া তা ফিরিয়ে দিয়েছে। কেন ফিরিয়ে দিল?
অনেক ইতস্তত করে করম আলি জানাল, নূরু-জলিকে পড়ায় যে মাস্টার, যার নাম রাজিন, তার সঙ্গে আলেয়ার সম্পর্ক। এই সম্পর্কটা আবার নাফিসা পছন্দ করে না। বশিরের আনা প্রস্তাবের তুলনায় রাজিন তো পথের ছেলে। এইসব।
বড় পুত্রবধূর কী ভূমিকা এই ব্যাপারে, জানার ইচ্ছা হল লতিফ সাহেবের। অথবা বড় ছেলের। কিন্তু তিনি চুপ করে থাকলেন। একসময় করম আলি জানাল, দুজন চুপচাপ আছে, কারণ বশিরের প্রস্তাবে তাদের সায় নেই, আবার রাজিন তাদের বিবেচনার অযোগ্য।
করমকে বেশ খুশি খুশি মনে হল। স্বাভাবিক। তাকে সবাই খুব খাটায়। তার ছেলেটাকেও। এখন খাটানেওলাদের বিড়ম্বনা দেখে তার তো মজা পাওয়ারই কথা।

৩. করমের খুশি এক সকালে অনেকটাই বাড়ল। লতিফ সাহেব ভোরের হাঁটা এবং নামাজ শেষে বাসায় ফিরে দেখলেন নাফিসাকে ধরাধরি করে একটা ভ্যান গাড়িতে তুলছে বশির আর বাবু। বশির গম্ভীর গলায় বাবাকে বলল, ‘বাবা, অনেক জটিলতা, শহরে চললাম, দোয়া কর।’
জটিলতা ঠিক কোন ধরনের তিনি জিজ্ঞেস করার সময় পেলেন না। পরে করম তাকে জানাল, জটিলতা সন্তান ধারণ নিয়ে। করমের বৌ বলেছে। তিন মাস বয়স ভ্রুণের, এখনই ফেলে দিতে হবে, অথবা নিজ থেকেই নিশ্চিহ্ন হবে  এরকম কিছু। কিন্তু করমের বউ নাফিসার বরাতে নাকি জানিয়েছে করমকে, আলেয়া বদদোয়া দেয়ায় বিপত্তিটা ঘটেছে।
লতিফ সাহেব বিচলিত হলেন। সারা জীবন মানুষের ভাল করেছেন। এই বয়সে এসে মানুষে মানুষে শত্রুতার গল্প তার ভাল লাগেনা, বিশেষ করে নিজের ঘরে।
ওইদিন রাতে রশিদ বলল আলেয়াকে, রাজিনকে সে আর আসতে মানা করে দিয়েছে। ওই ছেলেটাই সব গন্ডগোলের মূল। রশিদ গলাটা গম্ভীর করে বলল, এরপর আলেয়া যদি কোনো যোগাযোগ রাখে রাজিনের সঙ্গে, সে তাকে ঘর থেকে বের করে দেবে।
রাতের খাওয়ার টেবিলে কথাবার্তাগুলো হল। কথাবার্তা মানে একতরফা। রশিদের। কারণ কিছুক্ষণ শুনে আলেয়া টেবিল ছেড়ে উঠে দুদ্দাড় নিজের ঘরের দিকে রওনা দিল। যাওয়ার আগে হিসমিস গলায় জানিয়ে গেল, সে আত্মহত্যা করবে।
বড় বৌ আগাগোড়া চুপচাপ থাকল। বিষয়টা লতিফ সাহেবকে অবাক করল। সে আলেয়াকে থামালো না, এবং আত্মহত্যার ঘোষণা দেয়ার পরও কোনো বিকার দেখালো না। এ কেমন মা?
রাতে ঘুমাতে যাবার আগে লতিফ সাহেবের শেষ তামাকটা সেজে দিতে এসে করম আলি জানাল, নাফিসার সঙ্গে রাজিনকে সন্ধ্যার পর ঘাটের কাছে দেখা গেছে, মাস চারেক আগে। তারা অনেকক্ষণ একসঙ্গে ছিল। এরপরও তাদের একসঙ্গে দেখা গেছে। এ নিয়ে বশিরের সঙ্গে নাফিসার কথা কাটাকাটি হয়েছে। তারপর বশির আর রশিদের হাতাহাতি হয়েছে। আলেয়ার সঙ্গে বশিরের এক দফা এবং নাফিসার দুই দফা ঝগড়া হয়েছে।
কখন? খুব অবাক গলায় জিজ্ঞেস করলেন লতিফ সাহেব। করম অবাক হল। শোনেন নাই, আব্বা? পাড়ার মানুষ শোনে, আপনি শোনেন না?
এর দুদিন পর করম আলি তার স্ত্রীর বরাতে জানাল, নাফিসার গর্ভে যে ভ্রুণ, তার পিতৃত্ব নিয়ে সন্দেহ করেছে বশির। সেজন্য সেটি ফেলতে গিয়েছে শহরে। জটিলতা-ফটিলতা আসলেই কিছুনা।
লতিফ সাহেব জিভ কাটলেন। তার কান গরম হল।
অবশ্য এর একদিন পরই নাফিসাকে নিয়ে ফিরল বশির। লতিফ সাহেব জিজ্ঞেস করতে জানাল, এখন ভাল, তবে আবার যেতে হতে পারে। রশিদের কথায় কোনো উত্তাপ নেই। তাতে লতিফ সাহেবের একটু খটকা লাগল।
পরদিন কাক জাগার আগে ঘর থেকে বেরিয়ে নিজেকে খুব অসহায় মনে হল লতিফ সাহেবের। সারাটা জীবন তিনি দিয়েছেন পরিবারের পেছনে, তিন ছেলে মেয়েকে মানুষও করেছেন যতটুকু সাধ্য তার সবটুকু ঢেলে। মেয়েটি বিয়ের পর চলে গেল শহরে, স্বামীর সঙ্গে। কিন্তু লতিফ সাহেবের আনন্দ, মেয়েটি আদর্শ হয়েছে। দুই ছেলে নিয়েও তার তৃপ্তি, দুই পুত্রবধু নিয়েও। যতদিন রেজিয়া বানু ছিলেন, আদর্শ পথেই ছিল সংসারটি। কিন্তু এখন কী হল? এতসব বিরোধ, নোংরা আর কদর্য অভিযোগ। ছিঃ। নামাজ শেষে তিনি ইমাম সাহেবকে জিজ্ঞেস করলেন, একটা পরিবারে যখন বিরোধ-পারস্পরিক সন্দেহ দেখা দেয়, তখন পরিবারের কর্তার কী করার থাকে। ইমাম সাহেব হেসে বললেন, যার পরিবারে এসব চলছে, তার কর্তাকেই যেন তিনি তার সঙ্গে আলাপ করতে বলেন।
ইমাম সাহেবের মাথাতেই আসেনি, পরিবারটা হতে পারে লতিফ সাহেবের।
করম আলির কথাবার্তা বেড়ে গেল। একদিন সে বলল, তার ছেলে কামাল বলেছে আলেয়ার সঙ্গেও রাজিনকে দেখা গেছে। ঘাটের পাশে। গাছের নিচে। বৈঠক ঘরে নূরু-জলির পড়া শেষে আলেয়া-রাজিনকে জড়াজড়ি মেঝেতে দেখে রশিদ রাজিনকে জুতাপেটা করে বের করে দিয়েছে। তারপরও মরাখালের পাশে তাদের ঘাসে বসে থাকতে দেখেছে করম।
লতিফ সাহেব অসম্ভব বিপন্ন বোধ করতে থাকলেন এরপর। এক রাতে দুই ছেলেকে জিজ্ঞেস করলেন, কোনো সমস্যা হচ্ছে কিনা। রশিদ চোখ গোল করে তাকাল। বশির বেরিয়ে যাচ্ছিল। সে তাচ্ছিল্যের সঙ্গেই যেন বলল, সেটা ভাইয়াকে জিজ্ঞেস কর।
দুদিন পর সকালের নামাজের পর তিনি গেলেন মতিন মিয়াজির বাসায়। যৌবনে কোর্টের পেশকার ছিলেন। করম আলি তাকে বলেছে, পেশকার সাহেব তাকে সাহায্য করতে পারে। কিছু বিষয়ে।
কিছু বিষয় মানে জমিজমা, সম্পত্তি বণ্টন। লতিফ সাহেব সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, ছেলেদের সব জমি রেজিস্ট্রি করে দিবেন না। কিছু দেবেন করম আলিকে। কিছু বাড়ির পাশের স্কুলটাকে। পেশকার মিয়াজি এই সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানাল। এও বলল, করম আলিই তার প্রকৃত খেদমতগার, ছেলেরা নয়।
কাকডাকা শুরু হওয়ার আগে এক ভোরে বেরিয়ে তিনি দেখলেন, করম আলি হতভম্ভ বসে আছে রাস্তার পাশে। তার স্ত্রী দাঁড়িয়ে কাদছে। দুই হাতে দুই ছেলেমেয়ে।
করম জানাল, রশিদ তাকে বের করে দিয়েছে। এখন সে কোথায় থাকে?
লতিফ সাহেব তাকে অপেক্ষা করতে বলে হাঁটতে গেলেন। নামাজ শেষে ঘরে ফেরে রশিদকে জিজ্ঞেস করলেন, কেন সে করমকে বের করে দিয়েছে।
‘করম ভাই চুরি করেছে বাবা,’ ছেলে বলল। ‘করম ভাই ও তার বউ চুরি করে’।
বটে। কথাটা করমও বলেছে। ‘ওরা চুরির দোষ দিয়ে আমারে বাইর করব। দেখবেন, অথচ চুরি আমি জীবনে করছি? নাকি ওদের সব খবর জানি বইলা?’
কথাটা ঠিক। লতিফ সাহেব আর দুদিন ভাবলেন। তারপর কাক ভোরের আগেই ঘর থেকে বেরিয়ে পড়লেন।

৪. সকাল দশটা পর্যন্ত বাবা ফিরছেন না দেখে দুই ভাই বেরুলো। তারা অস্থির হয়ে খুঁজল। কেউ বলতে পারল না বাবা কোথায়। শেষ মেষ গরু নিয়ে মাঠে যাওয়া আলিফ মিয়া জানালো লতিফ সাহেব গেছেন পেশকারের বাসায়। পেশকারের বাসায় তাকে পাওয়া গেল না। তিনি শহরে গেছেন। পেশকার আর করম আলির সঙ্গে।
দুইভাই শহরে ছুটল।

৫. রাতের খাবার টেবিলে নাফিসা তাকে বলল, পুকুরের ঘাটে সে কামালের সঙ্গে সব্জির খেত পরিচর্যা করছিল।
বশির বলল, রাজিন খুব গরীব ছেলে। চারটা বোন, সে একমাত্র ভাই। চার বোনই বিয়ের অপেক্ষায়। এবং সবাই নির্ভরশীল রাজিনের উপর। এই ঘরে মেয়ের বিয়ে দেয়া যায়?
রশিদ বলল, একদিন রাজিন তার কাছে টাকা ধার চেয়েছে। মা অসুস্থ। সে টাকাটা দিত, কিন্তু পায়ে ধরায় সে ক্ষেপে গেছে। হ্যাঁ, পা দিয়ে উষ্টাও মেরেছে। টাকার জন্য পা ধরবে কেন? আলেয়া বলল, চার বোনকে সঙ্গে নিয়ে সে শতরঞ্জি বুনবে। শহরে বিক্রি করবে। রাজিন মাকে ভালবাসে। মায়ের জন্য সে আলেয়ার বাবার পাও ধরতে পারে। নাফিসা জানাল, রাজিনকে সে ছোট ভাইয়ের মতো দেখে। ছেলেটা ভাল। কিন্তু আলেয়ার যোগ্য নয়।
বড় বউ বলল, শশুরের ঘরটা কখনো দালান হোক, তা সে চায়না। নাফিসারও একই কথা। দালান হলে ভাইয়ে ভাইয়ে দূরত্ব বাড়বে। রশিদ দালানে যাবে না। বড় ভাই না গেলে ছোট ভাইয়ের যাওয়া কি উচিৎ হবে?
আলেয়া বলল, রাজিনের ব্যাপারটা সে দাদার ওপর ছেড়ে দিয়েছে। সে হেসে বলল, ‘দাদা, আপনিও তো দাদীকে বিয়ে করেছেন আপনার আব্বাজানের অমতে। দাদী নাকি ছোটঘরের ছিলেন। আপনি কি মনে করেন, দাদী ছোটঘরের ছিলেন? আপনিই বলুন। আপনি যা বলবেন, তাই আমি মেনে নেব’।
বড় বউ বলল, করম আলি শুধু চুরি করেছে, তা নয়, সে একজনের কথা আরেকজনকে লাগিয়েছে। তবে তাতে কোনো সমস্যা হয়নি।
নাফিসা বলল, ‘আব্বা, করম আলিকে কিছু জমি লিখেই দেন বরং। লোকটা বড় গরীব। যদি তাতে তার স্বভাব বদলায়’।

৬. হতভম্ব লতিফ সাহেব পরদিন ভোরে, কাকডাকার আগে, অন্যদিন যখন হাঁটতে বের হন, একটা স্বপ্ন দেখলেন। স্বপ্নে রেজিয়া বানু রেগে বলেছেন, ‘একটা পিচ্চি মেয়ের এত সাহস, বলে কিনা আমি ছোট ঘরের?’
‘মানুষ কত সহজে কত মিথ্যা বলে, দেখেন,’ তিনি লতিফ সাহেবের স্বপ্ন থেকে অদৃশ্য হওয়ার আগে তাঁকে বলতেন।
অনেকক্ষণ বিছানায় শুয়ে থাকলেন লতিফ সাহেব। আজ আর পৃথিবীর সামনাসামনি হতে ইচ্ছে করছে না তার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সমাজ ও রাজনীতি

শিল্প-সাহিত্য

ক্রীড়া

এবার আকাশে ওড়ার পালা

ফুটবলে আশার আলো মেয়েরা। সেই আলোটা দেখাচ্ছে কৃষ্ণা-সানজিদারা।…

ফটো গ্যালারি

বাবু বরকতউল্লাহ'র ফটোগ্রাফি

ভিডিও গ্যালারি

ফিচার

সৌদি মরুভূমিতে বাংলাদেশিদের মরুদ্যান

মরুভূমির দেশ সৌদি আরব। ঊষর মরুর ধূসর বুকেই কিনা গড়ে উঠেছে বাংলাদেশের সবুজের জয়গান! মরুভূমির ধুলাবালির মাঝে গড়ে উঠছে কৃষিখামার।…

বিনোদন

বাংলাদেশি মেয়েরা হবে মিস ওয়ার্ল্ড!

এবার বাংলাদেশি মেয়েরা অংশগ্রহণ করতে যাচ্ছে মিস ওয়ার্ড প্রতিযোগিতায়। চলতি বছর ১৮ নভেম্বর চীনে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ‘মিস ওয়ার্ল্ড’ প্রতিযোগিতার…

বাজার ও অর্থনীতি

সঞ্চয়পত্র বিক্রিতে সরকারের রেকর্ড

সরকারের সঞ্চয়পত্র বিক্রি রেকর্ড ছাড়িয়েছে। সদ্য সমাপ্ত ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৫২ হাজার ৩২৭ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি করেছে সরকার, যা এ…

রাজধানী

বইয়ের জগৎ

রাতের প্রতিপক্ষ একটি বাতি

অনাত্মীয় সুতোদোর টানাপোড়েনে তৈরি যে ঘনবদ্ধ কাপড় তা আপনার দেহকে ডেকে রাখবে সত্যি কিন্তু মনের আবেগকে না। অন্যের কাছে আত্মীয়হীন…

ইভেন্ট