পলল প্রকাশনী

আমার প্রথম বই

Scream
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আমার প্রথম দ্বিতীয় তৃতীয়… প্রকাশিত লেখাগুলো ইংরেজিতে। আমি তিনটি স্কুলে পড়েছিলাম শেষে গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি স্কুলে। তিনটিই বাংলা মাধ্যম স্কুল। ইংরেজিতে লেখার কারণ ‘ইংলিশ মিডিয়াম’-এ পড়াশোনা করে ডাট দেখানো, এমনকি ‘বেঙ্গলি মিডিয়াম’-এ পড়েও ইংরেজি কমিশন পড়া বন্ধু ও আত্মীয়দের দেখিয়ে দেয়া : শালা! আমিও কম নই। চাইলে শেকসপিয়ার, মিলটন, কিটস, ইয়েটস, এলিয়ট কিংবা পাগলা প্রজন্মের গিঞ্জবার্গ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারি।
ছেলে ইংরেজিতে লেখে বাবার এতেই মাটিতে পা পড়ে না এমন অবস্থা। কিন্তু যেদিন শুনলেন ছেলে বাংলা ধরেছে (বাংলা মদ নয়, বাংলা ভাষায় ছেলের লেখা ছাপা হয়েছে) রীতিমতো খেপে গেলেন, রবীন্দ্রনাথের ভূত চেপেছে বলে গালমন্দ করলেন এবং পড়াশোনা আর হবে না বলে ভবিষ্যদ্বাণী দিলেন।
এ বাণীর অনেকটা সত্যও হল। স্কুল ফাইনালে গণিত, পদার্থ বিজ্ঞান ও রসায়নে ঢাকা বোর্ডে সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়া ছেলে বাংলা ধরে এতটাই বখে গেল যে এইচএসসির গোটা পাঁচেক পরীক্ষা দিয়ে আর হলের দিকেই গেল না। বাবার পরবর্তী যুক্তিসঙ্গত হুকুম : বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাও।
এমন একটা সোনার (?) ছেলে অকালে নষ্ট হয়ে গেল দেখে আমার মাও যখন অশ্রুসিক্ত, বাবাই তাকে প্রবোধ দেন, চিন্তা করো না। ইংরেজি যখন জানে করে খেতে পারবে। মিথ্যে নয়। আসলেই এটা ওটা করে খাচ্ছি ইংরেজিতে। কিন্তু বাংলার মাদকতা যদি একবার পেয়ে বসে… এ কী আর সহজে ছাড়া যায়।
প্রথম বইটি হল ১৯৮৮তে, ইউপিএল থেকে এবং ইংরেজিতে। এ বইতে সাহিত্যের ছিটেফোঁটাও নেই। ভূমি সংস্কার নিয়ে লেখা। দ্বিতীয় বইটিও ইংরেজিতেই হতে যাচ্ছিল। তাও সাহিত্যবর্জিত অর্থনীতি বিষয়ে আমার বিলেতি পিএইচডির থিসিস। ইউপিএলের কর্ণধার মহিউদ্দিন ভাই একাধিকবার পাণ্ডুলিপি আকারে দিতে বলেছেন। দেয়া হয়নি। এসব গত শতকের কথা।
৩৩ দিনে আমার ছেলেবেলার বন্ধু বিখ্যাত কথাসাহিত্যিক মাইনুল আহসান সাবের দিব্যপ্রকাশ নামে বেশ দশাসই একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান চালু করে ফেলেছে। বলল, বই করবি না? একটা কিছু দে ছাপি।
বিভিন্ন পত্রিকার সাহিত্য পাতায় ছাপা হওয়া আট-ন’টা গল্প একত্র করে সাবেরকে দিলাম। সাবের বন্ধুত্বের কারণেই হোক কী সিএসআর (কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপন্সিবিলিটি!) হিসেবেই হোক ২০০২-এর বইমেলায় ৮৫ টাকা দাম সাব্যস্ত করে আমার গ্রন্থ ‘একটি পরিত্যক্ত কেলভিনেটর ফ্রিজের গল্প’ নিয়ে এলো।
আমার সৌভাগ্য উইয়ের খাবারে পরিণত হওয়ার আগেই বইগুলো শেষ হয়ে যায়। ১৯৮৮ ও ২০০২ এর মাঝে সহলেখক হিসেবে আমার ছ’সাতটি গবেষণাধর্মী গ্রন্থ/মনোগ্রাফ প্রকাশিত হলেও আমার প্রথম বই কোনটি জিজ্ঞেস করলে পরিত্যক্ত কেলভিনেটর ফ্রিজের গল্পের কথাই বলতে ইচ্ছা করে।
২০০২-এর আগেও শুভানুধ্যায়ীদের কেউ কেউ বলেছেন, দাও তোমার গল্পগুলো, কিংবা প্রবন্ধ কিংবা অনুবাদগুলো, বই করিয়ে দিই কিংবা প্রকাশক ধরিয়ে দিই। আস্থা পাইনি, কিংবা লেখাগুলো দিয়ে বই হতে পারে তাও ঠিক মনে হয়নি।
সাবের বলতেই বিশ্বাস হয়ে গেল। নতুবা আমার বই বেরোতে আরও অনেক বছর লেগে যেত।
বেলা শেষে সাবের বলল, তোর বই ১৫৬টা বিলি হয়েছে। ক্রেতাদের মধ্যে আমার ও সাবেরের যৌথ বন্ধুরাও আছে। তবে তাদের সংখ্যা কোনোভাবেই ১৫৬ নয়। তাহলে বাকি বইগুলো কারা কিনেছে? তাদের টাকা কি গাছে ধরে!
এর বার বছর পর ‘হুমায়ূন’ নামে আমার একটি গল্প ছাপা হয়। হুমায়ূন নাম শুনলেই পিত্তি জ্বলে যায় বুদ্ধিজীবী কিসিমের এমন একজন লেখকের একটি গ্রন্থের মোট তের কপি বিক্রি হয়। কিন্তু তারও হিসাব মিলে না। বারটি বই বিভিন্ন ক্রেতা কিনলেও তাদের মাধ্যমে দামটা তিনিই পরিশোধ করেছেন। একটি বইয়ের দাম তিনি দেননি। কে সেই মহানুভব ক্রেতা? তিনি হন্যে হয়ে তাকে খুঁজতে যাবেন যখন জানলেন হুমায়ূন আহমেদের বই তিরিশ হাজার বিক্রি হতে সময় লাগে না তিনি ভাবতে থাকেন হুমায়ূন আহমেদকে এতগুলো লোক খুঁজে বের করতে না জানি কত কষ্ট করতে হয়।
একজন দু’জন হলে আমিও খোঁজ করতাম। কিন্তু সংখ্যাটা যে এর চেয়ে কিছু বেশি! সাবের বলল, উপন্যাস চেষ্টা করে দেখ।
শামীম রেজা বলল, চেষ্টা করুন, আপনার হাতে উপন্যাস হবে। জাফর আহমেদ রাশেদ আমার একটি গল্প প্রত্যাখ্যান (?) করে বলল, এর ভেতর একটি উপন্যাস আছে, লিখে ফেলুন।
২০১০-এর ঈদ সংখ্যা ২০০০-এ বের হল আমার উপন্যাস কৃষ্ণকলি। আমার প্রিয় বন্ধুদের ক’জন বলল, সাবেরের ক্লাসমেট তাই ছেপেছে।
কয়েকদিনের মধ্যেই বাজারে এলো ঈদ সংখ্যা প্রথম আলো। তাতে আমার উপন্যাস প্রতিমন্ত্রী। আমিই এবার বললাম, সম্পাদক মতিউর রহমান আমার ক্লাসমেট, তাই ছেপেছেন। ক’দিনের মধ্যেই কালের কণ্ঠও বাজারে, এতে আমার উপন্যাস শর্মিষ্ঠা; প্রিয় বন্ধুদের আমি বললাম, আবেদ খানও আমার ক্লাসমেট তাই ছেপেছেন। সমকাল ছেপেছে হুসনে জান্নাতের একাত্তর যাত্রা। বন্ধুদের কল্যাণে আমার ক্লাসমেটের সংখ্যা বেশ বেড়ে গেল!
পলাশ মাহবুব একজন তরুণ প্রকাশক অন্বেষার কর্ণধার শাহাদত হোসেনকে নিয়ে এলো, অন্বেষা একটি কি দুটি উপন্যাস ছাপাতে আগ্রহী। কিন্তু ২০১১-র বইমেলায় অন্বেষা নিয়ে এল আমার চারটি উপন্যাস, এক প্যাকেটে : প্রতিমন্ত্রী, কৃষ্ণকলি, সূচনা ও সুম্মিতা এবং ট্যারা নভেরা। আমি ভয়ে ভয়ে বইমেলায় যাই। আমার বই ছেপে শাহাদত নিশ্চয়ই বিপাকে পড়েছেন। বইগুলো শেষ পর্যন্ত উইয়ের পেটে যাবে। কিন্তু মেলা শেষে শাহাদত যখন নগদ ছত্রিশ হাজার পাঁচশত টাকা দিয়ে বললেন, হিসাব হোক পরে আরও পাবেন, উইদের জন্য মন খারাপ হয়ে গেল, তাদের ভাগে কি কিছু থাকবে না? ২০১১ ও ২০১২-তে মেলায় ঘনঘন আসা যাওয়া করে বেশ বুঝতে পেরেছি: আসলেই উই রুচিশীল বইখেকো। বুদ্ধিজীবী কিসিমের কথাসাহিত্যিক থেকে শুরু করে একই ঘরানায় কবি পর্যন্ত অনেকের রচনাই পছন্দ করে। একবার বই হাতে নিলে যাদের বই আপনিই শেষ পৃষ্ঠা পর্যন্ত টেনে আনে, উই তাদের বই তেমন পছন্দ করে না।
সুতরাং বুঝে গেলাম সম্পাদক ও সমালোচকের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য লিখলে বই খেয়ে উইয়ের জ্ঞানবৃদ্ধি হবে, স্বাস্থ্যবৃদ্ধি হবে, দীর্ঘায়ু হয়ে বংশবৃদ্ধি করবে। আমি তাই ভনিতাপূর্ণ পাণ্ডিত্যের পথে পা না মাড়িয়ে সাধারণ পাঠকের জন্য (অসাধারণ পাঠক থেকে দূরে থাকা শ্রেয় ও স্বাস্থ্যকর মনে করে) লিখতে শুরু করলাম। যত কমই হোক, আমার যে ভরসা করার মতো কিছু সংখ্যক পাঠক আছেন তা টের পেলাম। সুতরাং লেখা চালিয়ে যাওয়ার প্রণোদনা সংকট আমার হবে না। সেই সঙ্গে প্রকাশকও যখন সম্মানিতে সম্মান জানাচ্ছেন, লেখার সময় বের করে নিতেই হবে।
প্রথম বই! প্রতিটি বই-ই আমার প্রথম বই। এ বইটি আগে লেখা হয়নি। বই প্রকাশিত হওয়ার আনন্দ ও উচ্ছ্বাসে ভাটা পড়েনি তবে আনন্দ ও উচ্ছ্বাস প্রকাশের ধরন বয়সের সঙ্গে সঙ্গে একটু একটু করে বদলে গেছে।
২০১৫-র বইমেলায় আমার চারটি নতুন বই এসেছে : টুইংকল টুইংকল (সময় প্রকাশন), সাতাশ বছর পর (জয়তী); অন্বেষা বের করেছে দুটি গল্পের বই শিমুর বিয়ের গল্প আর হুমায়ূন।
গল্পের বইয়ের নাম হুমায়ূন! প্রিয় বন্ধুরা বলতেই পারেন : আর কোনো নাম খুঁজে পেল না!
নালন্দা পরিবর্তিত সংস্করণ বের করেছে প্রিন্সেস ও বিদেশির চোখে ১৯৭১ বই দুটির। দ্বিতীয় বইটির মূল্য রাখা হয়েছে ৯৫০ টাকা। কে কেনবেন? প্রকাশক রেদওয়ানুর রহমানই আমাকে আশ্বস্ত করেন : যার প্রয়োজন তিনিই কিনবেন।
আমার বইয়ের যে পুনর্মুদ্রণ হচ্ছে, এটা মনে হচ্ছে বাড়তি পাওয়া। প্রথম বই কেলভিনেটর ফ্রিজের গল্প বাজারে নেই এক যুগ। সামনে নিশ্চয়ই আবার দেখা দেবে।
পাঠক দয়া করে বই পড়েন এই তো বেশি। গাঁটের পয়সা খরচ করেন বই কিনে কেউ দেওলিয়া হয় না হয়তো এ ভরসায়। তলস্তয় সম্ভবত মনে করতেন, এ ভারী অন্যায়। উল্টো লেখকের উচিত পাঠককে কিছু পয়সাকড়ি দেয়া। এমন যদি হতো! এই নিয়েই স্ত্রী সোনিয়ার সঙ্গে তার বিবাদ শেষ পর্যন্ত অজ্ঞাত অস্তাপোল স্টেশনে তার মৃত্যু।

আন্দালিব রাশদী কথাসাহিত্যিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সমাজ ও রাজনীতি

শিল্প-সাহিত্য

ক্রীড়া

এবার আকাশে ওড়ার পালা

ফুটবলে আশার আলো মেয়েরা। সেই আলোটা দেখাচ্ছে কৃষ্ণা-সানজিদারা।…

ফটো গ্যালারি

বাবু বরকতউল্লাহ'র ফটোগ্রাফি

ভিডিও গ্যালারি

ফিচার

সৌদি মরুভূমিতে বাংলাদেশিদের মরুদ্যান

মরুভূমির দেশ সৌদি আরব। ঊষর মরুর ধূসর বুকেই কিনা গড়ে উঠেছে বাংলাদেশের সবুজের জয়গান! মরুভূমির ধুলাবালির মাঝে গড়ে উঠছে কৃষিখামার।…

বিনোদন

বাংলাদেশি মেয়েরা হবে মিস ওয়ার্ল্ড!

এবার বাংলাদেশি মেয়েরা অংশগ্রহণ করতে যাচ্ছে মিস ওয়ার্ড প্রতিযোগিতায়। চলতি বছর ১৮ নভেম্বর চীনে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ‘মিস ওয়ার্ল্ড’ প্রতিযোগিতার…

বাজার ও অর্থনীতি

সঞ্চয়পত্র বিক্রিতে সরকারের রেকর্ড

সরকারের সঞ্চয়পত্র বিক্রি রেকর্ড ছাড়িয়েছে। সদ্য সমাপ্ত ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৫২ হাজার ৩২৭ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি করেছে সরকার, যা এ…

রাজধানী

বইয়ের জগৎ

রাতের প্রতিপক্ষ একটি বাতি

অনাত্মীয় সুতোদোর টানাপোড়েনে তৈরি যে ঘনবদ্ধ কাপড় তা আপনার দেহকে ডেকে রাখবে সত্যি কিন্তু মনের আবেগকে না। অন্যের কাছে আত্মীয়হীন…

ইভেন্ট