পলল প্রকাশনী

এ জীবন যেন রক্তাক্ত চন্দনের ধূপ

Scream
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  • আবুল কাইয়ুম
    অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৬-এ কবি প্রকাশনী প্রকাশ করেছে কবি বীরেন মুখার্জীর (জন্ম-১৯৬৯) অষ্টম কাব্যগ্রন্থ ‘হেমন্তের অর্কেস্ট্রা’। নব্বইয়ের দশকের অন্যতম এই কবির ‘হেমন্তের অর্কেস্ট্রা’ কাব্যগ্রন্থে সূচিভুক্ত ৫৬টি কবিতার বড় একটি অংশ জুড়ে দেখি, জগজ্জীবনের আলোক বিদীর্ণ করে হন্তারক অন্ধকারের উত্থান কীভাবে অর্জন ও প্রত্যাশাকে বিনষ্ট করছে সে সম্পর্কে কবির নানা অভিব্যক্তি। এই প্রকাশের মাঝে এবং এর বাইরেও কবি উপজীব্য করেছেন দেশপ্রেম, ইতিবাচক মানবিক চেতনা ও ঐতিহ্যসংলগ্নতা। তবে সব কিছু ছাপিয়ে সেই ঐতিহ্যের ‘রোদেলা দিন’, যা ছিল হৃদয়ের অনুপম প্রাপ্তি, হারানোর যন্ত্রণাটিই কবির অন্তরাত্মাকে প্লাবিত করে। সূচিত উজ্জ্বল সময়টি ক্রমান্বয়ে মৃত্যুময়তার কালো গর্ভে নিপতিত হওয়ার ঘটনাপুঞ্জ কবিকে করেছে যেন হতবাক ও নৈরাশ্যকাতর। এই দুঃসময় কবিমানসে ‘রোদের কঙ্কাল’ হয়ে ধরা দিয়েছে। তিনি অন্তরে শুঁষে নিয়েছেন প্রগতিমৃত্যুর বেদনা। এই ক্লেশটি তার কবিতায় কখনো এভাবে মূর্ত হয়ে ওঠে-
    ‘ব্যর্থ হয়ে যায়, এই জলকণা, এই দীর্ঘ ইতিহাস
    মেধার মন্দির থেকে নেমে যায় রক্ত, লোহিতকণিকা
    একাকী রাতের কাছে- এই অব্যক্ত হাওয়ায়
    অবিরাম লতার কৌশলে ঝরে- জীবনের জল!’
    (সন্দিগ্ধ বর্ষায় ভাঙে জলকেলি)
    সময়ের অন্ধকার কবিকে বিপন্নতা ও বিমর্ষতায় আচ্ছন্ন করে তোলে।
    তিনি উচ্চারণ করেন-
    ‘যখন সঘন অন্ধকার, একে একে গলে যায় অন্তঃপুর
    কতিপয় আরশোলার হুল ছুঁয়ে যায় তৃষ্ণার ঠোঁট
    নিজেকে খুঁজে পাই কাচের ভগ্নস্তূপে
    আমি কী মৃত্যুর খোলসে ঢাকা রয়েছি অনাদিকাল!’
    (মৃতের খোলস)
    এভাবে কবিকণ্ঠে শুনি প্রতিক্রিয়াশীলতার নখদন্তে আহত এই সময়ের কড়চা। তবে এর মাঝেও কবি যে আলোকসন্ধানী তা বুঝতে আমাদের অসুবিধে হয় না। আর সেই আকাক্সিক্ষত আলোটি হলো শান্তিময় ও বাসযোগ্য স্বদেশ-পৃথিবীর আলো। স্বাধীনতা ও মানবিকতার বিপর্যয়ের দারুণ ছবি আঁকেন কবি-
    ‘আমাদের স্বপ্ন, ঘুড়ি আর ওড়ার স্বাধীনতা
    ক্লান্ত হয়ে মিশে যায় ঘূর্ণিস্রোতে
    বাণিজ্যবাতাস গায়ে মেখে
    আমরা হয়ে উঠি সময়ের ক্রীতদাস।’
    (মাথার ভেতর অন্ধঘুড়ি ওড়ে)
    সত্য যে, পরিপার্শ্বের এই বিপন্ন দশাগুলো থেকে কবিমনে নৈরাশ্যবোধ জন্মায় ও তা একপ্রকার শূন্যবোধও বয়ে আনে। সমকালীন বাস্তবতার নিরিখে এ ধরনের চৈতন্যের উপস্থিতি খুবই স্বাভাবিক। স্বদেশের প্রতি গভীর ভালোবাসা থেকেই এর উদ্রেক। দেশ, দেশের মাটি, মানুষ, নিসর্গ ও লাল-সবুজ পতাকা কবির প্রাণে কতটা মহিমময় অবস্থান জুড়ে আছে তার প্রমাণ এই কবিতাংশ-
    ‘পৃথিবীর উর্বরতম এ মাটি আমার পবিত্র স্বাধীন ভূমি
    এখানে ঘুরপাক খায় প্রতিদিন সহস্র গানের কলি
    সুরের ছোঁয়ায় জেগে ওঠে কুলি ও মজুর
    তাদের চেতনার ভাঁজে এ মাটি বহমান জন্মের সমান্তরাল;
    এই হলুদ মাঠ আর শীতপ্রবণ ঘাসের পাঠশালা
    দিয়ে যায় পিঠা-উৎসব, লাল-সবুজ পতাকার
    গৌরব জড়ানো দিন…
    (পউষের কবিতা)
    কবি বীরেন মুখার্জীর কৃতির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিকটি, আমার মনে হয়েছে, তার চিত্রকল্প নির্মাণ-কুশলতা। তার চিত্রকল্পগুলো সরল চিত্রীর আঁকা প্রত্যক্ষ ছবি নয়। দৃশ্যমান শ্রেণির চিত্রকল্প অনেকের কবিতাতেই থাকে, কিন্তু তার কবিতায় এটা নেই। তার চিত্রকল্পগুলো গভীর অন্তর থেকে উঠে আসা এমন ছবি, যাতে রয়েছে অন্তরেরই পুরো ছাপ, অর্থাৎ শুধু বাস্তবের রঙে নয়, অনেকাংশে হৃদয়ের রঙে আঁকা। প্রাণ থেকে উৎসারিত এ সব ব্যতিক্রমী ছবিই তার কবিতাগুলোর অধিকাংশ এলাকা জুড়ে। চিত্রকল্পগুলো খুব তরতাজা, স্বাদু, দৃষ্টিনন্দন এবং ইন্দ্রিয়ের দ্বারা অনুভব্য। আমি বলবো, এগুলোর সব শুধু বিমূর্তই নয়, কিছু আছে পরাবাস্তবও। তার নান্দনিক চিত্রকল্পমালা থেকে কিছু উদাহরণ তুলে আনছি-
    ১. শীতকাল ফুটে থাকে কুয়াশাপ্রচ্ছদে
    ২. চুম্বনক্লান্ত ভোরের মখমলে গতিশীল ঘোড়ার টগবগে ওড়ে লাল ধুলো
    ৩. অবচেতনের জল ঠোঁটে নিয়ে উড়ে যাচ্ছে মেঘ/ কাশবনের ধার ঘেঁষে
    ৪. পূর্বনির্ধারিত বিকেলগুলোর ডানা ভাঙা রোদ/ তুলে ধরে বুকের ঐশ্বর্য; বানান ভুলতে থাকা/ কামপ্রবণ   চোখেরা ঢুকে পড়ে ধ্রুপদী নাচশালায়
    ৫. অবশেষে হাতের তালুতে দেখি পাতাঝরা শীত
    ৬. ঠোঁটের প্রসঙ্গ মাখে শিল্পের শিশির
    ৭. নির্বোধের মতো অনুরণিত স্ক্রিপ্ট খুলে/ বেরিয়ে আসে ঘোরানো সিঁড়ি, কাঠের ঘোড়া,/
    মাটির পরী- যুগপৎ ছায়া ও নারী
    কবি শুধু নিসর্গ থেকেই নয়, মিথ ও ঐতিহ্যসহ জীবনের নানা ভূমি থেকে আহরণ করেছেন তার কবিতার ছবির অনুষঙ্গ। আর সেগুলোকে সাজিয়েছেন গাঢ়বদ্ধ বাণীবন্ধে। ভাষিক বিন্যাসের দিক দিয়ে তার কবিতাগুলোতে রয়েছে দারুণ আধুনিকতার ছাপ। এর আগে প্রকাশিত তার অন্য কাব্যগুলো হচ্ছে- ‘উদ্বাস্তু সময়’(১৯৯৮, কলকাতা), ‘প্রণয়ের চিহ্নপর্ব’ (২০০৯), ‘প্লানচেট ভোর কিংবা মাতাল বাতাস’ (২০১১), ‘নৈঃশব্দের ঘ্রাণ’ (২০১২), ‘পালকের ঐশ্বর্য’ (২০১৩), ‘মৌনতা’ (২০১৩) এবং ‘জলের কারুকাজ’ (২০১৪)। এছাড়া তিনি দুটি প্রবন্ধ-গবেষণা গ্রন্থ, একটি ছোটগল্প ও একটি ইতিহাসগ্রন্থের লেখক। সাংবাদিকতা তার মূল পেশা। পাশাপাশি দীর্ঘ ২২ বছর ধরে সম্পাদনা করছে ‘দৃষ্টি’ নামে শিল্প-সাহিত্য বিষয়ক ছোট কাগজ। কর্মজীবনের এতসব ব্যস্ততার মাঝেও কবিতা অন্তঃপ্রাণ বীরেন মুখার্জী তার উজ্জ্বল সৃজনকর্মের দ্বারা ইতোমধ্যে সাহিত্যাঙ্গনে নিজের একটি অবস্থান তৈরি করে নিতে সক্ষম হয়েছেন।
    বীরেন মুখার্জীর কবিতায় ব্যবহৃত শব্দগুলো ব্যঞ্জনাপূর্ণ, শক্তিমত্তাময়। তিনি প্রচুর অর্থবোধক, বিশুদ্ধ যুগ্মশব্দ নির্মাণ করেছেন। তার ভাবনাগুলো একনাগাড়ে ভাষায় গড়িয়ে চলে, থমকে দাঁড়ায় না কোথাও। এই প্রবমানতা একবারেই তাঁর নিজস্ব। এটাকে শুদ্ধতর কাব্যশৈলী বলা যেতেই পারে। তার প্রতিটি কবিতা আপন ছন্দের মাধুরি মাখা। তিনি অক্ষরবৃত্তের অসমপর্বিক কবিতা যেমন লিখেছেন, তেমনি লিখেছেন গদ্যছন্দ ও মুক্তগদ্যের কবিতা। কিন্তু ছন্দপতন লক্ষ্য করা যায়নি কোথাও। ফলে যে কোনো বিচারে কবিতাগুলো শিল্পোত্তীর্ণ হবে বলে আমার বিশ্বাস। গ্রন্থটির বহুল প্রচার প্রত্যাশা করি।

    হেমন্তের অর্কেস্ট্রা বীরেন মুখার্জী
    প্রচ্ছদ: তৌহিন হাসান
    কবি প্রকাশনী মূল্য: ১৪০ টাকা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সমাজ ও রাজনীতি

শিল্প-সাহিত্য

ক্রীড়া

এবার আকাশে ওড়ার পালা

ফুটবলে আশার আলো মেয়েরা। সেই আলোটা দেখাচ্ছে কৃষ্ণা-সানজিদারা।…

ফিচার

সৌদি মরুভূমিতে বাংলাদেশিদের মরুদ্যান

মরুভূমির দেশ সৌদি আরব। ঊষর মরুর ধূসর বুকেই কিনা গড়ে উঠেছে বাংলাদেশের সবুজের জয়গান! মরুভূমির ধুলাবালির মাঝে গড়ে উঠছে কৃষিখামার।…

বিনোদন

মা হচ্ছেন সুনিধি চৌহান

সোমবার ছিল বলিউড গায়িকা সুনিধি চৌহানের ৩৩তম জন্মদিন। আর এদিনই জানালেন খুশির খবরটি, মা হতে চলেছেন এই গায়িকা। সম্প্রতি সুনিধি…

বাজার ও অর্থনীতি

সঞ্চয়পত্র বিক্রিতে সরকারের রেকর্ড

সরকারের সঞ্চয়পত্র বিক্রি রেকর্ড ছাড়িয়েছে। সদ্য সমাপ্ত ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৫২ হাজার ৩২৭ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি করেছে সরকার, যা এ…

রাজধানী

বইয়ের জগৎ

An error occured during creating the thumbnail.

রাতের প্রতিপক্ষ একটি বাতি

অনাত্মীয় সুতোদোর টানাপোড়েনে তৈরি যে ঘনবদ্ধ কাপড় তা আপনার দেহকে ডেকে রাখবে সত্যি কিন্তু মনের আবেগকে না। অন্যের কাছে আত্মীয়হীন…

ইভেন্ট

An error occured during creating the thumbnail.

মায়ের প্রতি ভালবাসা

আজ ১৪ মে রোববার বিশ্ব মা দিবস। মা দিবস একটি সম্মান প্রদর্শন জনক অনুষ্ঠান যা মায়ের সন্মানে এবং মাতৃত্ব, মাতৃক…