বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি কেন এমন

Scream
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

বাংলাদেশের সব থেকে বড় ট্রাজেডি এই যে, ১৯৭১ সালে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে জন্মলাভের সময় এখানে দেশ শাসন করার মতো কোনো সুগঠিত শাসকশ্রেণী, জাতীয় দল ও জাতীয় নেতা ছিল না। ঐতিহাসিক ঘটনাচক্রে আপাতদৃষ্টিতে হঠাৎ করে এক সংক্ষিপ্ত স্বাধীনতা সংগ্রামের মাধ্যমে এ দেশ স্বাধীন হওয়ার ফলে দেশ শাসনের ক্ষেত্রে কোনো রাজনৈতিক দলেরই যথাযথ প্রস্তুতি ছিল না, যে প্রস্তুতি স্বাভাবিকভাবে দীর্ঘ সংগ্রামের মাধ্যমে গড়ে ওঠে। অপ্রস্তুত অবস্থায় ঘাড়ের ওপর বড় রকম দায়িত্ব এসে পড়লে যা হয় বাংলাদেশের সদ্য আবির্ভূত শাসকশ্রেণী ও শাসক দলের ক্ষেত্রে তাই হয়েছিল।
মাঠেঘাটে, পথে-পথে সভা-সমিতি-মিছিল করে লোককে আন্দোলনে নামানো এবং তার জন্য উত্তেজিত বক্তৃতা করা এক কথা। অন্য কথা হল রাজনৈতিক লক্ষ্য-উদ্দেশ্য বিষয়ে জনগণকে যথাযথভাবে শিক্ষিত করা। রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্যে পরিকল্পিতভাবে শিক্ষার বিস্তার ঘটানো। দেশের পরিস্থিতি বিষয়ে নেতৃত্ব কর্তৃক পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে অবহিত হওয়া ও তা বিশ্লেষণ করা। ক্ষমতা দখলের পর কীভাবে দেশ পরিচালনা করা যাবে সে বিষয়ে নীতিনির্ধারণ করা। রাশিয়ায় তাদের পার্টির সাফল্য ও বিজয় সম্পর্কে বলতে গিয়ে লেনিন বলেছিলেন তাদের পার্টির সাফল্য ও বিজয়ের মূল কারণ ছিল দেশের এমন কোনো সমস্যা ছিল না যা তারা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করেননি। শুধু লেনিন নয়, রাজনৈতিক পার্টির অন্য নেতারাও এক্ষেত্রে যে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছিলেন তা ওয়াকিবহাল লোকদের ভালোভাবেই জানা।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে একথা বলার কোনো উপায় নেই। ১৯৪৭ থেকে পূর্ব বাংলায় একটা মধ্যশ্রেণী ব্রিটিশ আমল থেকে দ্রুত গড়ে উঠতে থাকলেও তারা ১৯৭১ সাল পর্যন্ত পরিপক্বতা অর্জনও করেনি। গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল আন্দোলনের কিছু অগ্রগতি ও সাফল্য সত্ত্বেও কমিউনিস্ট বা বামপন্থীরাও এদিক দিয়ে ব্যতিক্রম ছিল না। কিন্তু এদিক দিয়ে নিদারুণ ঘাটতি ছিল ষাটের দশকের শেষ দিকে পূর্ব পাকিস্তানের সর্বপ্রধান দল আওয়ামী লীগের। এই দলটিতে শিক্ষিত লোকের সংখ্যা নগণ্য ছিল। তখনকার দিনে ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম ইত্যাদি বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং কলেজ-স্কুলসহ অন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আওয়ামী লীগের কোনো অবস্থান শিক্ষকদের মধ্যে ছিল না। বুদ্ধিজীবী, সাহিত্যিক প্রভৃতির মধ্যেও আওয়ামী লীগের সমর্থক বিশেষ ছিল না। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের পর এদিক দিয়ে একটা পরিবর্তন দেখা যায়। তখন পাকিস্তানি শাসনের অবসান একটা সময়ের ব্যাপার, এটা মনে করে মধ্যবিত্তদের একটা বড় অংশ আওয়ামী লীগের দিকে ঝুঁকেছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ সংগঠনের মধ্যে তাদের কোনো অবস্থান ছিল না। এই সংগঠনটি মূলত গঠিত ছিল উকিল, দোকানদার, মাঝারি ব্যবসায়ী, বীমার দালাল, ছোট জমির অকৃষক মালিক, প্রাথমিক-মাধ্যমিক কিছু স্কুল শিক্ষক, ছাত্র, বেকার যুবক ইত্যাদির অনুৎপাদক লোকদের দ্বারা। এদের উল্লেখযোগ্য কোন শিক্ষা ছিল না। এদের ওপর ভিত্তি করে যে নেতৃত্ব গড়ে উঠেছিল তারও কোনো উপযুক্ত শিক্ষা ছিল না। হাতেগোনা কয়েকজনের কিছু শিক্ষাদীক্ষা থাকলেও আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব ছিল অর্ধশিক্ষিত। দেশের উৎপাদন ব্যবস্থা, বিভিন্ন শ্রেণীর পারস্পরিক সম্পর্ক, হাজারও সমস্যা সম্পর্কে তাদের কোনো জ্ঞান বা ধারণা ছিল না। এসব বিষয়ে মোটা দাগের ধারণা নিয়েই তারা রাজনীতির মাঠ গরম করে জনগণের মধ্যে নিজেদের একটা অবস্থান তৈরি করেছিল। কমিউনিস্টদের দেউলিয়াপনা এবং তত্ত্বগত ভুলভ্রান্তি আওয়ামী লীগকে প্রধান রাজনৈতিক দল হিসেবে উঠে আসতে যে সাহায্য করেছিল এতে সন্দেহ নেই। যাইহোক, ১৯৭১ সালে পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছিল যাতে সম্ভাব্য শাসক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের কোনো যোগ্যতা ও সামর্থ্য ছিল না। ১৯৭১ সালের সংকটজনক পরিস্থিতিতে কিভাবে নিজেদের রাজনৈতিক সংগ্রাম পরিচালনা করতে হবে এ বিষয়েও তাদের যে কোনো সুষ্ঠু ধারণা ও পরিকল্পনা ছিল না এটা পরিষ্কার বোঝা যায় স্বাধীনতা সংগ্রামের কথা উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা করা সত্ত্বেও সমগ্র পাকিস্তানি আক্রমণে-গুমে সমগ্র আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব, কর্মী বাহিনী তাদের সঙ্গে সদ্য সম্পর্কিত বুদ্ধিজীবীর দল কর্তৃক দেশের জনগণকে বিপদের মধ্যে ফেলে রেখে তাদের দেশ ত্যাগ ও ভারতে পলায়নের মধ্যে। সেখানে গিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন করার দায়িত্ব ভারত সরকারের ওপর অর্পণ করে নিজেরা স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারতীয় সরকার ও সেনাবাহিনীর সহায়ক শক্তির ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার মধ্যে। বর্তমানে বাংলাদেশী মধ্যবিত্ত, বুদ্ধিজীবীর দল ও আওয়ামী লীগের কাছে একথা যতই অপ্রিয় ও আপত্তিকর হোক, এর সত্যতা ঐতিহাসিকভাবে অস্বীকার করার কিছু নেই।
বাংলাদেশ এখন এক শোচনীয় রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। এ নিয়ে অনেক আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক, মাতামাতি বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে দেখা গেলেও এদের এই তৎপরতার ক্ষেত্রে যা লক্ষ্যণীয় তা হল এর কারণ অনুসন্ধানের ধারে কাছেও এরা নেই। এটাও এ দেশের মধ্যবিত্ত এবং শাসকশ্রেণীর এক অন্তর্নিহিত দুর্বলতা। দৃষ্টির কোনো গভীরতা এর মধ্যে নেই। কাজেই রাজনৈতিক সমালোচনার ক্ষেত্রে যা দেখা যায় তা হলো গালাগালি, খিস্তিখেউর, ব্যক্তিগত আক্রমণ এবং অশ্লীলতা। উপযুক্ত শিক্ষাদীক্ষা ও সুসংস্কৃতির অভাব রাজনীতি ক্ষেত্রে জনগণের জন্য কি সর্বনাশ ডেকে আনতে পারে এটা হল তারই এক বড় উদাহরণ।
উৎপাদনের সঙ্গে সম্পর্কহীন সমাজের বিভিন্ন অংশের দ্বারা গঠিত এটি রাজনৈতিক দল এবং অর্ধশিক্ষিত ও নিচু সাংস্কৃতিক মানসম্পন্ন নেতৃত্ব বাংলাদেশের শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়াই ছিল প্রধান কারণ যেজন্য প্রথম থেকেই বাংলাদেশ পরিণত হয়েছিল এক লুটতরাজের রাজত্বে। দেশের জনগণের জীবনের উন্নতি ও পরিবর্তনের পরিবর্তে যেভাবে শাসক দল ১৯৭১ সাল থেকেই নিজেদের পকেট ভর্তির এক ধনসম্পদ গড়ে তোলার খেলায় মত্ত হয়েছিল তার মধ্যেই যে বাংলাদেশের বর্তমান সংকটের মূল কারণ নিহিত আছে, এটা বোঝার ক্ষমতা এদেশের ফ্যাসিস্ট শাসকশ্রেণী, শাসক দল ও এদের ঘরানার বুদ্ধিজীবীদের নেই। এদের এ ক্ষমতা না থাকারই কথা, কারণ আত্মবিশ্লেষণ এবং আত্মসমালোচনা বড় কঠিন কাজ। এর জন্য প্রয়োজন সততা, উপযুক্ত শিক্ষা ও বুদ্ধির তৎকর্ষতা, যার কোনোটিই শাসক দল এবং এদের ঘরানার বুদ্ধিজীবীদের নেই।

বদরুদ্দীন উমর প্রাবন্ধিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সমাজ ও রাজনীতি

শিল্প-সাহিত্য

ক্রীড়া

এবার আকাশে ওড়ার পালা

ফুটবলে আশার আলো মেয়েরা। সেই আলোটা দেখাচ্ছে কৃষ্ণা-সানজিদারা।…

ফিচার

সৌদি মরুভূমিতে বাংলাদেশিদের মরুদ্যান

মরুভূমির দেশ সৌদি আরব। ঊষর মরুর ধূসর বুকেই কিনা গড়ে উঠেছে বাংলাদেশের সবুজের জয়গান! মরুভূমির ধুলাবালির মাঝে গড়ে উঠছে কৃষিখামার।…

বিনোদন

মা হচ্ছেন সুনিধি চৌহান

সোমবার ছিল বলিউড গায়িকা সুনিধি চৌহানের ৩৩তম জন্মদিন। আর এদিনই জানালেন খুশির খবরটি, মা হতে চলেছেন এই গায়িকা। সম্প্রতি সুনিধি…

বাজার ও অর্থনীতি

সঞ্চয়পত্র বিক্রিতে সরকারের রেকর্ড

সরকারের সঞ্চয়পত্র বিক্রি রেকর্ড ছাড়িয়েছে। সদ্য সমাপ্ত ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৫২ হাজার ৩২৭ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি করেছে সরকার, যা এ…

রাজধানী

বইয়ের জগৎ

An error occured during creating the thumbnail.

রাতের প্রতিপক্ষ একটি বাতি

অনাত্মীয় সুতোদোর টানাপোড়েনে তৈরি যে ঘনবদ্ধ কাপড় তা আপনার দেহকে ডেকে রাখবে সত্যি কিন্তু মনের আবেগকে না। অন্যের কাছে আত্মীয়হীন…

ইভেন্ট

An error occured during creating the thumbnail.

মায়ের প্রতি ভালবাসা

আজ ১৪ মে রোববার বিশ্ব মা দিবস। মা দিবস একটি সম্মান প্রদর্শন জনক অনুষ্ঠান যা মায়ের সন্মানে এবং মাতৃত্ব, মাতৃক…